গোলাপ ফুলের বাগান তৈরি করবেন যেভাবে

0

 

গোলাপ চাষ 


গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয় । বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে বহুজমিতে গোলাপের চাষ হচ্ছে এবং দিন দিন গোলাপের চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে । গোলাপ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ।


 জাত সমূহ 


পৃথিবীজুড়ে গোলাপের অসংখ্য জাত রয়েছে । জাতগুলোর কোনোটির গাছ বড় , কোনোটি ঝোপালো , কোনোটি লতানো । জাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গোলাপ সাদা , লাল , হলুদ , কমলা , গোলাপি এবং মিশ্র রঙের হয়ে থাকে । এ ছাড়াও রানী এলিজাবেথ ( গোলাপি ) , ব্ল্যাক প্রিন্স ( কালো ) , ইরানি ( গোলাপি ) , মিরিন্ডা ( লাল ) , দুই রঙা ফুল আইক্যাচার চাষ করা হয় । 


বংশবিস্তার 


গোলাপের বংশ বিস্তারের জন্য অবস্থাভেদে শাখা কলম , দাবা কলম , গুটি কলম ও চোখ কলম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় । নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য বীজ উৎপাদন করে তা থেকে চারা তৈরি করা হয় ।


 জমি নির্বাচন


 গোলাপ চাষের জন্য উর্বর দোআঁশ মাটির জমি নির্বাচন করা উত্তম । ছায়াবিহীন উঁচু জায়গা যেখানে জলাবদ্ধতা হয় না , এরূপ জমিতে গোলাপ ভালো জন্মে । 


জমি তৈরি 


নির্বাচিত জমি ৪-৫ টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা ও সমতল করতে হবে । এরপর মাটি কুপিয়ে ৫ সেমি উঁচু করে ৩ মি x ১ মি আকারের বেড বা কেয়ারি তৈরি করতে হবে । এভাবে কেয়ারি তৈরির পর নির্দিষ্ট দূরত্বে ৬০ সেমি X ৬০ সেমি আকারের এবং ৪৫ সেমি গভীর গর্ত খনন করতে হবে । গর্ভের উপরের মাটি ও নিচের মাটি আলাদা করে রাখতে হবে । চারা রোপণের ১৫ দিন আগে গর্ত করে খোলা রাখতে হবে । এ সময়ে গর্ভের জীবাণু ও পোকামাকড় মারা যায় । 


 সার প্রয়োগ 


প্রতি গর্ভের উপরের মাটির সাথে ছকে প্রদত্ত সারগুলো মিশিয়ে গর্তে ফেলতে হবে । এরপর নিচের মাটির সাথে ৫ কেজি পচা গোবর , ৫ কেজি পাতা পচা সার ও ৫০০ গ্রাম ছাই ভালোভাবে মিশিয়ে গর্তের উপরের স্তরে দিতে হবে । এভাবে গর্ত সম্পূর্ণ ভরাট করার পর ১৫-২০ দিন ফেলে রাখলে সারগুলো পচবে ও গাছ লাগানোর উপযুক্ত হবে । বর্ষাকালে যাতে গাছের গোড়ায় বৃষ্টির পানি জমে না থাকে , সে জন্য নালা তৈরি করতে হবে ।


 চারা বা কলম রোপণ 


আশ্বিন মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময় । তবে পৌষ মাস পর্যন্ত চারা লাগালে বেডের গর্তের মাঝখানে শাখা , রোগাক্রান্ত শিকড় ইত্যাদি কেটে ফেলতে হয় । চারা লাগিয়ে গোড়ায় শক্তভাবে মাটি চেপে দিতে হবে । চারা রোপণের পর চারাটি একটি খুঁটি পুতে খুঁটির সাথে বেঁধে দিতে হবে । চারা লাগিয়ে গোড়ায় পানি দেওয়া উচিত । ২-৩ দিন ছায়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হয় ।


 পরিচর্যা 


ক ) আগাছা দমন : গোলাপের কেয়ারিতে অনেক আগাছা হয় । আগাছা তুলে ফেলতে হবে । 


খ ) পানি সেচ : মাটির আর্দ্রতা যাচাই করে গাছের গোড়ায় এমনভাবে সেচ দিতে হবে যেন মাটিতে রসের ঘাটতি না হয় ।


 গ ) পানি নিকাশ : গোলাপের কেয়ারিতে কোনো সময়ই পানি জমতে দেওয়া উচিত নয় । কারণ গোলাপ গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না । 


ঘ ) ডাল - পালা ছাঁটাইকরণ ( Prunning ) : গোলাপের নতুন ডালে বেশি ফুল হয় । তাই পুরাতন ও রোগাক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করা প্রয়োজন । প্রতিবছর গোলাপ গাছের ডালপালা ছাঁটাই করলে গাছের গঠন কাঠামো সুন্দর ও সুদৃঢ় হয় এবং অধিক হারে বড় আকারের ফুল ফোটে । 


ঙ ) ফুলের কুড়ি ছাঁটাই : অনেক সময় ছাঁটাই করার পর মূলগাছের ডালে অনেক কুঁড়ি জন্মায় । সবগুলো কুঁড়ি ফুটতে দিলে ফুল তেমন বড় হয় না । তাই বড় ফুল ফোটার জন্য মাঝের কুঁড়ি রেখে পাশের কুঁড়িগুলো ধারালো চাকু দিয়ে কেটে দিতে হয় । 


 পোকা মাকড় ব্যবস্থাপনা


 গোলাপ গাছে যেসব পোকা দেখা যায় তন্মধ্যে রেড স্কেল ও বিটল প্রধান । 


ক ) রেড স্কেল : 


এ পোকা দেখতে অনেকটা মরা চামড়ার মতো । গরমের সময় বর্ষাকালে এর আক্রমণ বেশি পরিলক্ষিত হয় । এ পোকা গাছের বাকলের রস চুষে খায় । ফলে বাকলে ছোট ছোট কালো দাগ পড়ে । প্রতিকার না করলে আক্রান্ত গাছ মারা যায় । গাছের সংখ্যা কম হলে দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়ে আক্রান্ত স্থানে ব্রাশ করলে পোকা পড়ে যায় । ম্যালাথিয়ন বা ডায়াজিনন জাতীয় কীটনাশক প্রয়োগ করে এ পোকা দমন করা যায় ।


খ।  বিটল পোকা :


 শীতকালের শেষে এ পোকার আক্রমণ পরিলক্ষিত হয় । এ পোকা গাছের কচি পাতা ও ফুলের পাপড়ি ছিদ্র করে খায় । সাধারণত রাতের বেলা আক্রমণ করে । আলোর ফাঁদ পেতে এ পোকা দমন করা যায় । ম্যালাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ছিটিয়ে এ পোকা দমন করা যায় ।


 রোগ ব্যবস্থাপনা 


গোলাপ গাছে অনেক রোগ হয় । তন্মধ্যে কালো দাগ পড়া রোগ , ডাইব্যাক ও পাউডারি মিলডিউ প্রধান ।


ক ) কালো দাগ পড়া রোগ :


 এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ । রোগাক্রান্ত গাছের পাতায় গোলাকার কালো রঙের দাগ পড়ে । আক্রান্ত গাছের পাতা ঝরে গিয়ে গাছ পত্রশূন্য হয়ে যায় । চৈত্র থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত এ রোগের আক্রমণ ঘটে । এ রোগের প্রতিকারের জন্য গাছে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে । গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সে দিকে খেয়াল করতে হবে । এ ছাড়া ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করে এ রোগ দমন করা যায় । আক্রান্ত পাতাগুলো কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হয় । 


খ ) ডাইব্যাক : 


ডাল ছাঁটাইয়ের কাটা স্থানে এ রোগ আক্রমণ করে । এ রোগ হলে গাছের ডাল বা কাগু মাথা থেকে কালো হয়ে নিচের দিকে মরতে থাকে । এ লক্ষণ ক্রমে কাণ্ডের মধ্য দিয়ে শিকড় পর্যন্ত পৌঁছে এবং সম্পূর্ণ গাছ মারা যায় । এ রোগ দমন করতে হলে আক্রান্ত কাণ্ড বা ডালের বেশ নিচ থেকে কেটে পুড়ে ফেলতে হবে । ডাল ছাঁটাইয়ের চাকু জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ডাল ছাঁটাই করা উচিত । কর্তিত স্থান স্পিরিট দিয়ে মুছে দিতে হবে । 


গ ) পাউডারি মিলডিউ :


 এটি একটি ছত্রাক জনিত রোগ । শীতকালে কুয়াশার সময় এ রোগের বিস্তার ঘটে । এ রোগে আক্রান্ত হলে পাতা , কচিফুল ও কলিতে সাদা পাউডার দেখা যায় । ফলে কুঁড়ি না ফুটে নষ্ট হয়ে যায় । এ রোগ দমন করতে হলে আক্রান্ত ডগা বা পাতা তুলে পুড়িয়ে দিতে হবে । এছাড়া থিওভিট বা সালফার , ডাইথেন এম -৪৫ যে কোনো একটি পানিতে মিশিয়ে সপ্তাহে একবার স্প্রে করে এ রোগ দমন করা যায় । 


ফুল সংগ্রহ


 ফুল ফোটার পূর্বেই গাছ হতে ফুল সংগ্রহ করতে হয় । সংগ্রহের পর ফুলের ডাটার নিচের অংশ পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে ঠাণ্ডা জায়গায় রাখলে ফুল ভালো থাকে । মাঝে মাঝে ফুলে পানির ছিটা দেওয়া ভালো ।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)