১১টি ঔষধি গাছ ও এর ব্যবহার

0

 ঔষধি উদ্ভিদ ও এর ব্যবহার


 আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অতি প্রাচীনকাল থেকে রোগব্যাধি উপশমে বিভিন্ন রকম উদ্ভিদ ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে । ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয় বলে এসব উদ্ভিদকে ঔষধি বা ভেষজ উদ্ভিদ বলা হয় । নিম্নে কয়েকটি ভেষজ উদ্ভিদের পরিচিতি ও ব্যবহার আলোচনা করা হলো ।


 ১। থানকুনি : 

থানকুনি


থানকুনি একটি ছোট লতানো বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ । এর প্রতি পর্ব থেকে নিচে মূল এবং উপরে শাখা ও পাতা গজায় । পাতা সরল বৃক্কের মতো , একাত্তর ।

 ব্যবহার্য অংশ : সমস্ত উদ্ভিদ

 ব্যবহার : ছেলে মেয়েদের পেটের অসুখ , বিশেষ করে বদহজম ও আমাশয় রোগ নিরাময়ে থানকুনি খুব বেশি ব্যবহৃত হয় । এছাড়া থানকুনি আয়ুবর্ধক , স্মৃতিবর্ধক , আমরক্ত নাশক , চর্মরোগনাশক । 


২। তুলসী : 

তুলসী


তুলসী অতিপরিচিত বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ । এটি সাধারণত ৩০ সেমি হতে ১ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে । পাতা সরল , প্রতিমুখ , ডিম্বাকার , সুগন্ধযুক্ত । শীতকালে ফুল ও ফল হয় । 

ব্যবহার্য অংশ : পাতা 

ব্যবহার : সাধারণ সর্দি - কাশিতে তুলসী পাতার রস বেশ উপকারী । ছোট ছেলেমেয়েদের তুলসী পাতার রসের সাথে আদার রস ও মধু মিশিয়ে খাওয়ানো হয় ।


 ৩। কালোমেঘ : 

কালোমেঘ



এটি একটি ছোট বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ । সাধারণত ২০ সেমি থেকে ১ মিটার উঁচু হয় । পাতা সরল , প্রতিমুখ , কিছুটা লম্বা ধরনের । পাতা তিতা । বর্ষার শেষ হতে শীতকাল পর্যন্ত ফুল ও ফল হয় ।

 ব্যবহার্য অংশ : সমস্ত গাছ , বিশেষ করে পাতা

 ব্যবহার : ছোট ছেলে - মেয়েদের জ্বর , অজীর্ণ ও লিভার দোষে এর রস একটি অত্যন্ত ভালো ঔষধ । 


৪। বাসক : 

বাসক


গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ । পাতা সরল , প্রতিমুখ , লম্বাকৃতি । 

ব্যবহার্য অংশ : পাতার নির্যাস

 ব্যবহার : কাশি নিরাময়ে অধিক ব্যবহৃত হয় । সমপরিমাণ আদার রস ও মধুসহ বাসক পাতার রস খেলে কার্যকরী হয় । 


৫। সর্পগন্ধা : 

সর্পগন্ধা


সর্পগন্ধা একটি বহুবর্ষজীবী বিরুৎ । প্রতিপর্বে সাধারণত ৩ টি পাতা থাকে । বর্ষায় ফুল ও ফল হয় । ফল পাকলে কালো হয় ।

 ব্যবহার্য অংশ : মূল বা ফলের রস

 ব্যবহার : সর্পগন্ধার মূলের বা ফলের রস উচ্চ রক্তচাপে ব্যবহৃত হয় । পাগলের চিকিৎসায়ও এটি ব্যবহৃত হয় । 


৬। অর্জুন : 

অর্জুন


অর্জুন মাঝারি থেকে বৃহদাকৃতির বৃক্ষ । কাণ্ড সরল উন্নত , মসৃণ এবং আকর্ষণীয় হয়ে থাকে । গাছ থেকে সহজে ছাল উঠানো যায় । পাতা সরল , লম্বা , ডিম্বাকৃতির । ফুল হলুদাভ ক্ষুদ্রাকৃতির , উগ্র গন্ধবিশিষ্ট ।


ব্যবহার্য অংশ: পাতা,ছাল,ফল, ও কাঠ।


ব্যবহার : 


কাঁচা পাতার রস আমাশয় রোগ উপশমে ব্যবহৃত হয় । অর্জুনের ছাল ভালোভাবে বেটে তার রস চিনি ও দুধের সাথে প্রত্যহ সকালে সেবনে যাবতীয় হৃদরোগ আরোগ্য হয় । নিম্ন রক্তচাপ থাকলে অর্জুনের ছাল সেবনে উপকার হয় । ছালের রস সেবনে উদরাময় ও অর্শ রোগের উপশম হয় । রক্ত আমাশয়ে অর্জুনের ছালের চূর্ণ দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে নিরাময় হয় । অর্জুনের ছালের মিহি গুঁড়া মধুর সাথে মিশিয়ে মুখে লাগালে মেচতার দাগ মিলিয়ে যায় । 


৭। হরিতকী : 

হরিতকী


বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ । পাতা সরল , একাত্তর , উপবৃত্তাকার , সবৃত্তক । ফুল শ্বেতবর্ণ ও ছোট হয় । ফল লম্বাকার হালকা খাঁজযুক্ত । 

ব্যবহার্য অংশ : ফল ও কাঠ

 ব্যবহার : আয়ুর্বেদিক ঔষধ ত্রিফলার অন্যতম ফল হরিতকী । হরিতকী ফল চূর্ণ করে একটু লবণ মিশিয়ে সেবন করলে অর্শ্বরোগ নিরাময় হয় । হরিতকী চূর্ণ পাইপে ভরে ধূমপান করলে হাঁপানি উপশম হয় । যে কোনো ক্ষতে হরিতকী পোড়া ছাইয়ের সাথে মাখন মিশিয়ে লাগালে ঘা সেরে যায় । চিনি ও পানির সাথে হরিতকী চূর্ণ ব্যবহার করলে চোখ উঠা ভালো হয় । কাঁচা ফল আমাশয় এবং পাকাফল রক্তশূন্যতা , পিত্তরোগ , হৃদরোগ , গেটেবাত ও গলা ক্ষতে ব্যবহার্য । ফলচূর্ণ দত্তরোগ উপশমে ব্যবহৃত হয় । হরিতকী বলবৃদ্ধিকারক , জীবনীশক্তি বৃদ্ধিকারক ও বার্ধক্য নিবারক । 


৮। আমলকী :

আমলকী


 মাঝারি আকারের বৃক্ষ । পাতা যৌগিক , উপপত্র বিপরীতভাবে বিন্যস্ত । ফুল ছোট , সবুজাভ হলুদ । ফল রসাল , মাংসল , সবুজ , গোলাকৃতি , মুখরোচক ও উপাদেয় । মার্চ থেকে মে মাসে ফুল আসে । 

 ব্যবহার্য অংশ : ফল 

ব্যবহার : আমলকী পাতার রস আমাশয় প্রতিষেধক এবং টনিক । ফল ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এবং ত্রিফলার একটি ফল । ফলের রস যকৃৎ , পেটের পীড়া , অজীর্ণতা , হজম ও কাশিতে বিশেষ উপকারী । আমলকীর ফল ত্রিফলার সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করলে রক্তহীনতা , জন্ডিস , চর্মরোগ , ডায়াবেটিস , চুল পড়া , প্রভৃতি রোগের উপশম হয় ।


 ৯। বহেড়া :

বহেড়া


 এটি একটি শাখা - প্রশাখাযুক্ত বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ । পাতা একক , বোঁটা লম্বা । ফুল সবুজাভ সাদা , ডিম্বাকৃতির । ফলে একটি করে বীজ থাকে । ফল গোলাকৃতির বা ঈষৎ লম্বাটে ।


 ব্যবহার্য অংশ : ফল 


ব্যবহার : ত্রিফলার অন্যতম ফল বহেড়া । বীজের শাঁস ( বাদামের মতো ) দুইএকটি করে দুঘণ্টা অন্তর এবং দিনে দুইটি করে চিবিয়ে খেলে হাঁপানি রোগ আরোগ্য হয় । বহেড়া চূর্ণ সকাল - বিকাল পানিসহ খেলে উপকার হয় । ফল পেটের পীড়া , অর্শ্ব , কোষ্ঠকাঠিন্য , ডায়রিয়া ও জ্বরে ব্যবহার্য । ফল হৃৎপিণ্ড , ফুসফুস , নাসিকা , গলার রোগ ও অজীর্ণতার ভালো ঔষধ । বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল মাথা ঠাণ্ডা রাখে এবং চুল পড়া বন্ধ করে ।


১০। ঘৃত কুমারী : 

ঘৃত কুমারী


বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ । পাতা লম্বা , কিনারা খাঁজ কাটা , রসাল ।


 ব্যবহার্য অংশ : পাতা থেকে নির্গত ঘন পিচ্ছিল রস । 


ব্যবহার : 


পাতা থেকে নির্গত ঘন পিচ্ছিল রস কোষ্ঠকাঠিন্য রোগের ফলপ্রসু ঔষধ । এটি ক্ষুধামন্দা , জন্ডিস , লিউকোমিয়া , অর্শ্বরোগ , কাটা - পোড়া ও ক্ষতের চিকিৎসায় ফলপ্রসূ অবদান রাখে । প্রসাধন দ্রব্যে এর মিশ্রণে প্রসাধনের মান উন্নত হয় ।


 ১১। তেলাকুচা : 

তেলাকুচা


এটি লতানো বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ । বন বাদাড়ে আপনা - আপনি এ গাছ , জন্মাতে দেখা যায় ।


 ব্যবহার্য অংশ : কাণ্ড ও পাতা


 ব্যবহার : 


এ উদ্ভিদের কাণ্ড ও পাতার নির্যাস ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয় । এর নির্যাস সর্দি , জ্বর , হাপানি ও মূর্ছারোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় । চর্মরোগে এর পাতা বাটার প্রলেপ বেশ উপকারী ।



 ঔষধি গুণসম্পন্ন বিভিন্ন উদ্ভিদের প্রয়োজনীয়তা 


অতি প্রাচীনকাল থেকে ঔষধি গুণসম্পন্ন বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ রোগ নিরাময় উপশমে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে আসছে । আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যাপক উন্নতির পিছনে ঔষধি উদ্ভিদের গুরুত্ব অপরিসীম । আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষের নিকট ঔষধি উদ্ভিদের মাধ্যমে রোগ নিরাময় খুবই জনপ্রিয় । কারণ ঔষধি উদ্ভিদের চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য , সস্তা এবং তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই । এ কারণে বর্তমানে ঔষধি গুণসম্পন্ন আয়ুর্বেদী ও ইউনানি চিকিৎসা ব্যবস্থাও আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ।


 আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উৎকর্ষ চরমে পৌঁছালেও মানুষ আবার সেই প্রাচীন ঔষধি গুণসম্পন্ন উদ্ভিদের ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে । পৃথিবীর বহুদেশ ভেষজ ঔষধের উৎকর্ষ সাধনের জন্য ব্যাপক গবেষণা শুরু করেছে । বাংলাদেশে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যাপক চাষাবাদ ও যত্নের মাধ্যমে ঔষধশিল্পের ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল ।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)